SMART FARM OR WORK STATION

আমাদের দেশের অর্থনীতিতে বিশাল অবদান রয়েছে কৃষির। কিন্তু কৃষিকাজের ক্ষেত্রে, অর্থাৎ খাদ্য উৎপাদন কিংবা পশুপালনে আমাদের কৃষকদেরকে বড় ধরনের কিছু সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। সবচেয়ে বড় সমস্যাটা হলো মূলধনের। এবং যদি তারা মূলধন জোগাড় করতে পারেও, বিনিময়ে তাদেরকে দিতে হয় চড়া মূল্য।
কৃষকদের এ সমস্যা কিন্তু একেবারে নতুন কিছু নয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই অঞ্চলের কৃষকরা এমন অবস্থার সাথে পরিচিত চিরকাল। কৃষিকাজের জন্য মূলত দুটি জিনিসের দরকার হয়- একটি হলো জমি বা গবাদি পশু, অপরটি হলো চাষাবাদ বা পশুপালনের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধন। কিন্তু আবহমানকাল ধরে বাংলাদেশের কৃষকরা ভুগে এসেছেন এই দুইয়ের সঠিক ভারসাম্যের অভাবে। কারো হয়তো জমি বা গবাদি পশু আছে কিন্তু নগদ মূলধন নেই। আবার কারো চাষাবাদ বা পশুপালনের জন্য নগদ মূলধন আছে, কিন্তু চাষের জমি বা গবাদি পশু নেই।

অতীতে অন্তত চাষাবাদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কৃষকেরা একটি সম্ভাব্য সমাধান খুঁজে বের করতে পেরেছিলেন। সেই সমাধানের নাম বর্গাচাষ। ১৯৮৪ সালের ভূমি সংস্কার অধ্যাদেশ মতে, কোনো ব্যক্তি যখন কোনো জমির মূল মালিকদের নিকট হতে কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য ঐ জমি হতে ফসলের ভাগ দেওয়ার শর্তে জমি চাষাবাদ করেন, তখন এ ধরনের চাষাবাদকে বলে বর্গাচাষ।

ইতিহাসের সেই বর্গাচাষের ব্যবস্থা বিলুপ্ত হতে চললেও, কৃষক ও খামারিদের জন্য কৃষিকাজকে নতুন আঙ্গিকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক করে তোলার প্রয়াসে, অনেকটা বর্গা ব্যবস্থার অনুকরণেই নতুন একটি প্রযুক্তি নির্ভর প্রকল্প নিয়ে হাজির হয়েছে আই-ফার্মার। একটি দারুণ পরিকল্পনার মাধ্যমে এখন বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে বাংলাদেশে চাষাবাদ ও পশুপালনে স্পন্সরশিপের সুযোগ সৃষ্টি করবে আমাদের প্রতিষ্ঠানটি।

সহজ কথায় বলতে গেলে, এসো এ আরডি এল এর ইশপ স্মার্ট হোম ফার্মারের মূল লক্ষ্য হলো একটি টেকসই মাস্টাপ্ল্যান প্ল্যাটফর্মে গোটা কৃষি সরবরাহ চক্র গড়ে তোলা। তারা কৃষিব্যবসায় আগ্রহী শহরের পৃষ্ঠপোষকদের গবাদি পশুপালনে স্পন্সরশিপের সুযোগ করে দিয়ে থাকে, যার মাধ্যমে কৃষক পায় সুদবিহীন মূলধন অর্জনের সুযোগ। এর মাধ্যমের একইসাথে শহরের পৃষ্ঠপোষকরা পাচ্ছেন একটি ব্যতিক্রমধর্মী আয়ের উৎস, আবার কৃষকও হচ্ছেন ঋণের বোঝা মুক্ত।

ধরা যাক, আপনি আপনার অর্থ এসো ইশপের ফার্মারের সহায়তায় কোনো গবাদিপশুর খামারের কাজে লাগাতে চান। এক্ষেত্রে আপনাকে পার হতে হবে নিম্নোক্ত ধাপগুলো:

খামার বাছাই
প্রথম ধাপ হলো কতগুলো পশুর পেছনে অর্থ স্পন্সর করবেন সে সিদ্ধান্ত নেওয়া। আই-ফার্মারের ওয়েবসাইটের নমুনায় সরবরাহকৃত খামারগুলোর মধ্য থেকে যেকোনো একটি আপনাকে বেছে নিতে হবে, এবং সেই খামারের নির্দিষ্ট সংখ্যক পশুর পেছনে স্পন্সরশিপের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

আই-ফার্মারের মূল লক্ষ্য হলো একটি গোটা কৃষি সরবরাহ চক্র গড়ে তোলা; Image Source: eshop-Farmer
মূল্য পরিশোধ
দ্বিতীয় ধাপে আই-ফার্মারের সুরক্ষিত অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম অথবা ব্যাংক চেকের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সংখ্যক পশুর জন্য অর্থ পরিশোধ করতে হবে। অর্থপ্রাপ্তির পর আই-ফার্মার নিশ্চিত করবে যেন বাজার থেকে সর্বোৎকৃষ্ট মানের পশু নিয়ে আসা হয়। এরপর তারা কয়েকজন খামারিকে বাছাই করবে, যারা ওই পশুগুলোকে পালনের দায়িত্বে থাকবেন।

মালিকানার সনদপত্র
প্রতিটি পশুরই একটি স্বতন্ত্র নম্বর থাকবে এবং আই-ফার্মার আপনাকে আপনার ক্রয়কৃত পশুগুলোর রশিদ এবং ‘মালিকানার সনদপত্র’ প্রদান করবে। এছাড়া আপনাকে একটি অনলাইন ড্যাশবোর্ডের প্রবেশাধিকার দেওয়া হবে, যেখান থেকে আপনি আপনার পশুর স্বাস্থ্য, বৃদ্ধি ও অন্যান্য বিষয়ের হালনাগাদ তথ্য জেনে নিতে পারবেন।

পশুপালন
পরবর্তী ১ বছর আই-ফার্মারের নিয়োগপ্রাপ্ত খামারিরা আপনার মালিকানাধীন পশুটিকে যত্ন সহকারে লালন-পালন করবেন। আপনার পশুর গুণগতমান ঠিক থাকছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে আই-ফার্মারের প্রতিনিধিরাও ঐ খামার নিয়মিত পরিদর্শন করবেন।

খামারিরা আপনার মালিকানাধীন পশুটিকে যত্ন সহকারে লালন-পালন করবেন; Image Source: i-Farmer
বিক্রি ও লভ্যাংশ
এভাবে প্রথম চক্রের সমাপ্তি ঘটলে, আই-ফার্মার কর্তৃপক্ষ আপনার হয়ে আপনার পশুগুলোকে বিক্রি করে দেবে এবং লভ্যাংশ আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেবে।

আই-ফার্মারের এই উদ্ভাবনী উদ্যোগ সকল শ্রেণী-পেশার স্পন্সর বা পৃষ্ঠপোষকদের জন্যই বাড়তি আয়ের নতুন দিগন্ত উন্মোচনে সক্ষম। তবে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে অবশ্যই শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণী, যারা তাদের সঞ্চিত অর্থ লাভজনক ও নিশ্চিন্ত থাকা যায় এমন কোনো খাতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। আর এই মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অর্থনৈতিক সচ্ছলতা মানে হলো সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসা।

এদিকে ভুলে গেলে চলবে না গ্রামীণ দরিদ্র কৃষকদের কথাও। তাদের জীবনেও কিন্তু নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে আই-ফার্মার। এই প্রতিষ্ঠানের সাথে কাজ করে জীবন পাল্টে গেছে, এমন একজন হলেন লালমনিরহাটের এক প্রত্যন্ত গ্রামের গবাদি পশুর খামারি মিনু। এর আগে তার কাছে পর্যাপ্ত মূলধন ছিল না। তাই মোটা অংকের টাকা ঋণ নিয়ে তাকে পশুপালন করতে হতো। সারা বছর অক্লান্ত পরিশ্রমের পরও তিনি কোনো সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের দেখা পেতেন না, কেননা আয়কৃত অর্থের অধিকাংশই চলে যেত মুনাফাসহ ঋণের টাকা পরিশোধে।

কিন্তু আই-ফার্মারের সাথে যুক্ত হওয়ার পর বদলে গেছে মিনুর সংগ্রামী জীবন। এখন তাকে আর সার্বক্ষণিক ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে ঘুরতে হচ্ছে না, বরং আই-ফার্মারের পৃষ্ঠপোষকদের কাছ থেকে পাওয়া মূলধন নিয়ে তিনি বেশ ভালোভাবেই পশুপালন করতে পারছেন, এবং অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা আসায় পরিবারের ভরণপোষণেও আর কোনো সমস্যা হচ্ছে না তার।

সব মিলিয়ে কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে কৃষিকাজের সাথে আধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধনের মাধ্যমে দুর্দান্ত এক প্রকল্প বাস্তবায়ন করে চলেছে আই-ফার্মার। কে জানে, ছোট্ট এই উদ্যোগই যখন ডালপালা মেলে মহীরুহে পরিণত হবে, তখন হয়তো বাংলাদেশের কৃষিক্ষেত্রেও ঘটবে নবজাগরণের সূচনা। আমাদের কৃষকদের মুখে যখন হাসি ফুটবে এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণী ভাবনাহীন ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে পারবে, তখন আর কে ঠেকাবে বাংলাদেশের অগ্রগতি!

Visit
https://www.charityuniversity-bd.com/un-bd-sdg2030-eshoardl/

Some Views

পুঁজিবাদী বিশ্বের ফর্মুলা মোতাবেক শুরুতেই মুক্ত বাজার অর্থনীতি আমাদের জন্য মারাত্মক হয়েছে। উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে শুরুতেই এই সিস্টেম বৈষম্য এতটাই বাড়িয়ে দিয়েছে যে তার ডায়নামিক ইনারশিয়া বা গতিময়তা আর থামানো যাচ্ছে না, বৈষম্য আরও বেড়েই যাচ্ছে। ধনবানদের হাতে ক্ষমতার পুরোটাই চলে গেছে, সেই ক্ষমতা তারা ইউজ করছে আরও ধনী তথা পাওয়ারফুল হবার জন্য।

এখন ব্যবসায়ীদের দৌরাত্মে দেশ পুরাই নাজুক একটা অবস্থানে চলে গেছে, বৈষম্য হয়ে পড়েছে সীমাহীন। ঘনবসতিপূর্ণ একটা উন্নয়নশীল দেশে সোশ্যালিস্ট ইকনোমি শুরুতে খুব দরকার। চীন, ভিয়েতনাম, এক সময়ের রাশিয়া এই প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করেছে। আমাদের দেশে গ্রামাঞ্চলগুলোতে যেসব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডগুলো চলছে সেসবের রেট অব রিটার্ন খুব কম। গুরুশিল্পগুলো প্রাইভেটাইজেশনে চলে যাওয়ায় লভ্যাংশগুলো জনগণের হাতে পৌঁছাতে পারছে না। বিপুল পরিমাণ উৎকোচ দিয়ে ধনী ব্যবসায়ীরা অনেক বিপুল পরিমাণ ট্যাক্সও ফাঁকি দিয়ে দিচ্ছে। নামে বেনামে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক শিল্পপতি ৮/১০ কোটি টাকা ট্যাক্স দিয়ে সিআইপি খেতাব কিনে নিচ্ছেন। দরিদ্র জনগণের জমি অধিগ্রহন করে পরে লিজ দিয়ে যে আবাসন প্রকল্পগুলো চলেছে সেগুলোর মূল লভ্যাংশ ভোগকারিও কিন্তু ধনিক শ্রেণীই। আবার এটাও সত্য যে, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো অলৌকিকভাবে শুধু ক্ষতিই প্রদর্শন করে চলেছে এবং প্রাইভেটাইজেশনের পক্ষে যুক্তি জোরালো করছে। এতেও কলকাঠি নাড়ছে সেই ধনিক শ্রেণীই। তারা এখন এতটাই শক্তিশালী যে, রাষ্ট্রযন্ত্রের যেকোন জনমঙ্গলজনক সিদ্ধান্তকেও তাদের পক্ষে নিয়ে যেতে আমূল পালটে ফেলতে পারছে, প্রতিটা সিদ্ধান্তে নিজেদের মুনাফাকে প্রোথিত করে ফেলছে।

এমনিতেই পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে বৃহৎ পুঁজিপতি কর্তৃক ক্ষুদ্র পুঁজিপতির সামান্য পুঁজির আত্মসাৎ প্রক্রিয়া সতত চলমান। শেয়ার বাজার সেই প্রক্রিয়াকে স্রেফ অধিকতর বেগবান করার নিষ্ঠুর হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আসলে পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিশিষ্ট একটি দেশের সরকারেরও ক্ষমতা নেইএর লাগাম টেনে ধরার। পুঁজিবাদ আর তার ভৃত্য শেয়ার বাজারের চরিত্রটাই এমন। দেশের কতিপয় দরিদ্র বেকার যুবক তাদের সামান্য পুঁজি এই জুয়ার আসরে বিনিয়োগ করছে এবং বড় পুঁজিপতিরা কয়েকদিন পরপরই তাদের সামান্য পুঁজিটুকুও আত্মসাৎ করছে। এটা তারা বন্ধ করবেও না। তাদের খাসলতটাই এমন। কিন্তু আমরা গরীবরা তো এই জুয়ায় অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকতে পারি। শর্টকাটে রঙিন দুনিয়া পাওয়ার লোভে সর্বস্ব খুইয়ে লাভ কি? হ্যাঁ, হয়ত ভাগ্যের খেলায় কেউ কেউ জয়ী হয়ে যায়, কিন্তু সে যে লাখে একজন। বাকি নিরানব্বুই হাজার ন’শো নিরানব্বুইজনের অবস্থা যে খারাপ হয়ে যাচ্ছে। আপনারা বরং সবাই এই ক্ষুদ্র পুঁজি একত্রিত করে গ্রামেই সমবায়মূলক ব্যবসা চালু করতে পারেন। আর এটা করতেই হবে। ধনীর বিনিয়োগ তাকেই শুধু ধনী করছে আর দরিদ্রকে দিচ্ছে নামমাত্র খাওয়া পরার সঙ্কুলান। মানসম্মত শিক্ষা, সুচিকিৎসা, মননশীল বিনোদন সবই তার নাগালের বাইরেই রয়ে যাচ্ছে। এই দেশে দুই তিন দশক আগেও গ্রাম থেকেই প্রকৃত মেধাবীরা বেরিয়ে আসত, এখন পড়াশোনা পুরাই অর্থবানদের দখলে চলে যাচ্ছে।

গ্রামে সত্যিকার অর্থে উন্নয়নের তেমন কোন ছোঁয়া লাগেনি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে সেক্টর অর্থাৎ প্রাথমিক শিক্ষা, সেইটার মান খুবই সঙ্গিন। এই ক্ষেত্রে উন্নয়ন না করতে পারলে আসলে তেমন কোন লাভ নেই। শিক্ষা বিনে জনগণের মোটিভেশনাল স্পিরিট চেঞ্জ করা যায় না, তারা নিজের জীবনমান উন্নয়নের তাগিদ অনুভব করে না, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারও নিয়ন্ত্রণ করা যায় না, কার্যকরভাবে অন্যান্য উন্নয়নের সুফল ভোগ করাও অসম্ভব। দৈনিক মাথাপিছু এক ডলারের উপরে আয়, সামান্য বিদ্যুৎ, আর দুইটা ইটের বাসা দিয়ে জীবনমানের প্রকৃত উন্নয়ন মুশকিল। এখন প্রশ্ন হল, প্রত্যন্ত গ্রামে কি শহরে প্রাপ্ত সুবিধাসমূহের প্রাপ্যতা সৃষ্টি করা সম্ভব? আসলে এইটার চেষ্টা করতে হবে। সম্ভব হতেও পারে। যুক্তি দিয়ে ভাবলে অসম্ভব নয়।

প্রথমতঃ গ্রামেই বিনিয়োগ করতে হবে। গ্রামবাসীকে সেই বিনিয়োগে অংশ নিতে হবে। শহুরে ধনীর গ্রাম্য বিনিয়োগে বেশ কিছু সমস্যা আছে। প্রথমতঃ সে নিজের লাভটাকে সবার উপরে প্রাধান্য দেবে। তার বিনিয়োগের ফলে গ্রামবাসীর কিছু কর্মসংস্থান হতে পারে, কিন্তু শিল্প থেকে অর্জিত মুনাফার অংশ গ্রামবাসী পাবে না। ফলে তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থানের তেমন কোন পরিবর্তন হবে না, কোনভাবে দিন এনে দিন খেয়ে একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই বানিয়ে জীবন গুজরান করে দেবে। তাদের ছেলেমেয়েরাও ভাল শিক্ষা পাবে না। একই চক্র চলতে থাকবে বছরের পর বছর। অর্থনীতি একসময় স্থবির বা Stagnant হয়ে যাবে। গ্রামের মানুষ একসাথে কোথাও বিনিয়োগ করলে সবাই সেই বিনিয়োগের বিষয়ে একটা ওঊনারশীপ (Ownership) অনুভব করবে, কাজটার প্রতি মায়া থাকবে, তা যে কাজই হোক না কেন। আমি একত্রে বিনিয়োগের খুব বড় অ্যাডভোকেট। কেননা আমি দেখেছি গ্রামে কিভাবে একজন আরেকজনের পুকুরে বিষ ঢেলে সযত্নে লালিত মাছ মেরে ফেলে, কিভাবে আরেকজনের ক্ষেতের ফসল জ্বালিয়ে দেয়, কচি বাঁশের মোথা মুড়িয়ে দেয়। একসাথে সবার বিনিয়োগ থাকলে এই পরশ্রীকাতরতা থাকবে না। লভ্যাংশ সবাই বিনিয়োগ অনুপাতে ভাগ করে নেবে। এক্ষেত্রে সরকার মধ্যস্ততাকারী হতে পারে। বিনিয়োগ স্বল্প হতে পারে, কিন্তু তা গ্রামবাসীকেই করতে হবে। ব্যাঙ্ক লোন বা ধনীর বিনিয়োগের প্রতি লোভ কমাতে হবে। ব্যাঙ্ক লোন নেওয়া যেতে পারে তবে তা গ্রামবাসীই নেবে এবং গ্রামেই বিনিয়োগ করবে।

এখন প্রশ্ন হল, গ্রামবাসী কিসে বিনিয়োগ করবে? গ্রামীণ অর্থনীতি এখনও কৃষিনির্ভর। এখনই ডিজিটাল ইন্ডাসট্রি বা হাইটেক শিল্প স্থাপনের ক্ষমতা আমাদের নেই। আর বেশিরভাগ কৃষির সমস্যা হল রেইট অফ রিটার্ন বা মুনাফার হার কম। এখানে আমাদের কৃষকদের বুদ্ধি খাটাতে হবে। যাই চাষ হোক না কেন, তাতে নিজেদেরই ভ্যালু অ্যাড করতে হবে। যেমন চাউল থেকে পাফড রাইস বা ভুট্টা থেকে কর্ন ফ্লেক্স এই টাইপের রূপান্তর শুরু করতে হবে এবং তা গ্রামেই। এখন প্রশ্ন দাঁড়ায়, কিভাবে তা সম্ভব? আসলে সবাই মিলে বিনিয়োগ করলে এই ধরণের ফ্যাক্টরি করা কোন ব্যাপারই নয়। দেখা যায়, গ্রামের চাউলের বা মুড়ির কল একজন মালিকের এবং তিনিই গ্রামের সবচেয়ে ধনী মানুষ। এই বিষয়টার বাত্যয় দরকার। সব কৃষক মিলে ফ্যাক্টরি দিতে পারে। যদি গ্রামে ১০০০ একর কৃষিজমি থাকে তাহলে ১০ একরে ফ্যাক্টরি দিয়ে বাকি ৯৯০ একরে চাষ চালাতে হবে। জমিতে উৎপন্ন ফসল ঐ ফ্যাক্টরিতে পণ্যে রূপান্তর করতে পারলে লাভ সাত/আট গুণও করা সম্ভব। এক কেজি ভুট্টার দাম মাত্র ৪০/৫০ টাকা কিন্তু ১ কেজি কর্ন ফ্লেক্সের দাম ৬০০/৭০০ টাকা, অর্থাৎ উৎপাদন খরচ বাদ দিলেও রূপান্তরের ফলে মুনাফা বেড়ে যাবে অনেক গুণ। বর্তমানে এই কর্ন ফ্লেক্স বা মুড়ির উৎপাদন পুরাই ধনিক শ্রেণী দ্বারা পরিচালিত। এই পরিচালনার ভার গ্রামবাসীকেই নিতে হবে। একসাথে নিতে হবে, মোড়লের হাতে দিলে হবে না।

উদ্ভিজ্জ ফসল থেকে প্রাণীজ উৎপাদনেও মুনাফার হার বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। একই পরিমাণ জমিতে ধান চাষ করলে যে লাভ, মুরগি, মাছ বা টার্কি চাষ করলে একই সময়ে তার ৪/৫ গুণ লাভ করা সম্ভব। এইভাবে সেক্টর পরিবর্তন করেও আমাদের কৃষকগণ মাথাপিছু আয় অনেক বাড়াতে পারেন। আবার প্রাণীজ উৎপাদের রূপান্তর ঘটিয়ে মুনাফা আরও বাড়ান সম্ভব। যেমন মাংসের বিভিন্ন রেডিমেইড আইটেম বানানো সম্ভব। মাংসের শুঁটকি বা জার্কি, অথবা প্রক্রিয়াজাত রান্না করা মাংস ইত্যাদি উৎপাদন করে মুনাফা আরও বৃদ্ধি সম্ভব, বিদেশেও রপ্তানি করা যেতে পারে। এগুলোর জন্য খুব স্পেশাল কোন দক্ষতাও দরকার নেই। তবে এসব প্রক্রিয়াজাতকরণ গ্রামেই করতে হবে, গ্রামবাসীকেই করতে হবে। সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট দক্ষ করতে।

সমগ্র উৎপাদন এবং বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়াটি সমন্বিত হওয়া আবশ্যক। অর্থাৎ গ্রামবাসীকেই একসাথে উৎপাদিত পণ্য পরিবহনের জন্য ট্রাক কিনতে হবে, নিজেদের কাউকেই সেই ট্রাক চালাতে হবে। শহরে বিক্রির জন্য দোকান ভাড়া করতে বা কিনতে হতে পারে। কিন্তু তা নিজেদেরকেই করতে হবে, তাহলে সর্বাধিক মুনাফা গ্রামবাসীর হাতেই থাকবে।

গ্রামবাসী যে মুনাফা পাবেন তা দিয়ে নিজেদের অবস্থানের পরিবর্তনের সাথে সাথে গ্রামেই কিছু সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধির চেষ্টা করবেন। যেমনঃ গ্রামেই ভাল খাবার, থাকার ব্যবস্থা, পরিবহন, বিনোদন ইত্যাদির উৎকর্ষ সাধনের চেষ্টা করবেন, যেন মানুষ গ্রামে থাকতে উৎসাহিত হয়, নরকের মত নোংরা দূষিত শহরে যেতে না চায়। এমন করলে গ্রামেই ভাল শিক্ষকগণ চলে আসবেন, থাকবেন এবং বাচ্চাদের পড়াবেন। গ্রামবাসীর ভেতর থেকেই ভাল শিক্ষক তৈরি করতে হবে। কেউ শহরে শিক্ষকতায় ভাল করলে তাকে আবার গ্রামে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। এভাবে সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধির মাধ্যমে ডাক্তারদেরও গ্রামেই রাখা সম্ভব।

এসব ভাবলে অনেকটা ইউটোপিয়ান মনে হয়। কিন্তু আমি তরুণদের মাঝে এমন সম্ভবনাময় মানুষ দেখি যারা এমন পরিবর্তন সাধনে সক্ষম। গ্রামেও আছে এমন মানুষ। তাঁদের দরকার উৎসাহ, সমর্থন আর সাহস। আসুন আমরা সবাই মিলে গ্রামের মানুষের শহর অভিমুখিনতা কমানোর চেষ্টা করি, গরীবের কষ্টার্জিত অর্থের ধনী অভিমুখিনতা দমানোর চেষ্টা করি। গ্রামেই মানসম্মত জীবনযাপনের সুযোগসুবিধাগুলো সৃষ্টি করি। নয়ত সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা অসম্ভব; সীমাহীন বৈষম্যে ভরা সমাজ সোনার হয় কিভাবে? এক্ষেত্রে সরকার এবং সরকারি কর্মচারীগণ অসামান্য সহযোগী ভূমিকা পালন করতে পারেন। তবে গ্রামীণ অর্থনীতির মূল বিনিয়োগকারী এবং চালিকাশক্তি হিসেবে গ্রামবাসীকেই অবতীর্ণ হতে হবে। এইটা গ্রামবাসীর বোঝা বড্ড জরুরী। বোঝানোও জরুরী।

Comments (1)

  1. moonni

    Reply

    পুঁজিবাদী বিশ্বের ফর্মুলা মোতাবেক শুরুতেই মুক্ত বাজার অর্থনীতি আমাদের জন্য মারাত্মক হয়েছে। উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে শুরুতেই এই সিস্টেম বৈষম্য এতটাই বাড়িয়ে দিয়েছে যে তার ডায়নামিক ইনারশিয়া বা গতিময়তা আর থামানো যাচ্ছে না, বৈষম্য আরও বেড়েই যাচ্ছে। ধনবানদের হাতে ক্ষমতার পুরোটাই চলে গেছে, সেই ক্ষমতা তারা ইউজ করছে আরও ধনী তথা পাওয়ারফুল হবার জন্য।

    এখন ব্যবসায়ীদের দৌরাত্মে দেশ পুরাই নাজুক একটা অবস্থানে চলে গেছে, বৈষম্য হয়ে পড়েছে সীমাহীন। ঘনবসতিপূর্ণ একটা উন্নয়নশীল দেশে সোশ্যালিস্ট ইকনোমি শুরুতে খুব দরকার। চীন, ভিয়েতনাম, এক সময়ের রাশিয়া এই প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করেছে। আমাদের দেশে গ্রামাঞ্চলগুলোতে যেসব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডগুলো চলছে সেসবের রেট অব রিটার্ন খুব কম। গুরুশিল্পগুলো প্রাইভেটাইজেশনে চলে যাওয়ায় লভ্যাংশগুলো জনগণের হাতে পৌঁছাতে পারছে না। বিপুল পরিমাণ উৎকোচ দিয়ে ধনী ব্যবসায়ীরা অনেক বিপুল পরিমাণ ট্যাক্সও ফাঁকি দিয়ে দিচ্ছে। নামে বেনামে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক শিল্পপতি ৮/১০ কোটি টাকা ট্যাক্স দিয়ে সিআইপি খেতাব কিনে নিচ্ছেন। দরিদ্র জনগণের জমি অধিগ্রহন করে পরে লিজ দিয়ে যে আবাসন প্রকল্পগুলো চলেছে সেগুলোর মূল লভ্যাংশ ভোগকারিও কিন্তু ধনিক শ্রেণীই। আবার এটাও সত্য যে, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো অলৌকিকভাবে শুধু ক্ষতিই প্রদর্শন করে চলেছে এবং প্রাইভেটাইজেশনের পক্ষে যুক্তি জোরালো করছে। এতেও কলকাঠি নাড়ছে সেই ধনিক শ্রেণীই। তারা এখন এতটাই শক্তিশালী যে, রাষ্ট্রযন্ত্রের যেকোন জনমঙ্গলজনক সিদ্ধান্তকেও তাদের পক্ষে নিয়ে যেতে আমূল পালটে ফেলতে পারছে, প্রতিটা সিদ্ধান্তে নিজেদের মুনাফাকে প্রোথিত করে ফেলছে।

    এমনিতেই পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে বৃহৎ পুঁজিপতি কর্তৃক ক্ষুদ্র পুঁজিপতির সামান্য পুঁজির আত্মসাৎ প্রক্রিয়া সতত চলমান। শেয়ার বাজার সেই প্রক্রিয়াকে স্রেফ অধিকতর বেগবান করার নিষ্ঠুর হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আসলে পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিশিষ্ট একটি দেশের সরকারেরও ক্ষমতা নেইএর লাগাম টেনে ধরার। পুঁজিবাদ আর তার ভৃত্য শেয়ার বাজারের চরিত্রটাই এমন। দেশের কতিপয় দরিদ্র বেকার যুবক তাদের সামান্য পুঁজি এই জুয়ার আসরে বিনিয়োগ করছে এবং বড় পুঁজিপতিরা কয়েকদিন পরপরই তাদের সামান্য পুঁজিটুকুও আত্মসাৎ করছে। এটা তারা বন্ধ করবেও না। তাদের খাসলতটাই এমন। কিন্তু আমরা গরীবরা তো এই জুয়ায় অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকতে পারি। শর্টকাটে রঙিন দুনিয়া পাওয়ার লোভে সর্বস্ব খুইয়ে লাভ কি? হ্যাঁ, হয়ত ভাগ্যের খেলায় কেউ কেউ জয়ী হয়ে যায়, কিন্তু সে যে লাখে একজন। বাকি নিরানব্বুই হাজার ন’শো নিরানব্বুইজনের অবস্থা যে খারাপ হয়ে যাচ্ছে। আপনারা বরং সবাই এই ক্ষুদ্র পুঁজি একত্রিত করে গ্রামেই সমবায়মূলক ব্যবসা চালু করতে পারেন। আর এটা করতেই হবে। ধনীর বিনিয়োগ তাকেই শুধু ধনী করছে আর দরিদ্রকে দিচ্ছে নামমাত্র খাওয়া পরার সঙ্কুলান। মানসম্মত শিক্ষা, সুচিকিৎসা, মননশীল বিনোদন সবই তার নাগালের বাইরেই রয়ে যাচ্ছে। এই দেশে দুই তিন দশক আগেও গ্রাম থেকেই প্রকৃত মেধাবীরা বেরিয়ে আসত, এখন পড়াশোনা পুরাই অর্থবানদের দখলে চলে যাচ্ছে।

    গ্রামে সত্যিকার অর্থে উন্নয়নের তেমন কোন ছোঁয়া লাগেনি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে সেক্টর অর্থাৎ প্রাথমিক শিক্ষা, সেইটার মান খুবই সঙ্গিন। এই ক্ষেত্রে উন্নয়ন না করতে পারলে আসলে তেমন কোন লাভ নেই। শিক্ষা বিনে জনগণের মোটিভেশনাল স্পিরিট চেঞ্জ করা যায় না, তারা নিজের জীবনমান উন্নয়নের তাগিদ অনুভব করে না, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারও নিয়ন্ত্রণ করা যায় না, কার্যকরভাবে অন্যান্য উন্নয়নের সুফল ভোগ করাও অসম্ভব। দৈনিক মাথাপিছু এক ডলারের উপরে আয়, সামান্য বিদ্যুৎ, আর দুইটা ইটের বাসা দিয়ে জীবনমানের প্রকৃত উন্নয়ন মুশকিল। এখন প্রশ্ন হল, প্রত্যন্ত গ্রামে কি শহরে প্রাপ্ত সুবিধাসমূহের প্রাপ্যতা সৃষ্টি করা সম্ভব? আসলে এইটার চেষ্টা করতে হবে। সম্ভব হতেও পারে। যুক্তি দিয়ে ভাবলে অসম্ভব নয়।

    প্রথমতঃ গ্রামেই বিনিয়োগ করতে হবে। গ্রামবাসীকে সেই বিনিয়োগে অংশ নিতে হবে। শহুরে ধনীর গ্রাম্য বিনিয়োগে বেশ কিছু সমস্যা আছে। প্রথমতঃ সে নিজের লাভটাকে সবার উপরে প্রাধান্য দেবে। তার বিনিয়োগের ফলে গ্রামবাসীর কিছু কর্মসংস্থান হতে পারে, কিন্তু শিল্প থেকে অর্জিত মুনাফার অংশ গ্রামবাসী পাবে না। ফলে তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থানের তেমন কোন পরিবর্তন হবে না, কোনভাবে দিন এনে দিন খেয়ে একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই বানিয়ে জীবন গুজরান করে দেবে। তাদের ছেলেমেয়েরাও ভাল শিক্ষা পাবে না। একই চক্র চলতে থাকবে বছরের পর বছর। অর্থনীতি একসময় স্থবির বা Stagnant হয়ে যাবে। গ্রামের মানুষ একসাথে কোথাও বিনিয়োগ করলে সবাই সেই বিনিয়োগের বিষয়ে একটা ওঊনারশীপ (Ownership) অনুভব করবে, কাজটার প্রতি মায়া থাকবে, তা যে কাজই হোক না কেন। আমি একত্রে বিনিয়োগের খুব বড় অ্যাডভোকেট। কেননা আমি দেখেছি গ্রামে কিভাবে একজন আরেকজনের পুকুরে বিষ ঢেলে সযত্নে লালিত মাছ মেরে ফেলে, কিভাবে আরেকজনের ক্ষেতের ফসল জ্বালিয়ে দেয়, কচি বাঁশের মোথা মুড়িয়ে দেয়। একসাথে সবার বিনিয়োগ থাকলে এই পরশ্রীকাতরতা থাকবে না। লভ্যাংশ সবাই বিনিয়োগ অনুপাতে ভাগ করে নেবে। এক্ষেত্রে সরকার মধ্যস্ততাকারী হতে পারে। বিনিয়োগ স্বল্প হতে পারে, কিন্তু তা গ্রামবাসীকেই করতে হবে। ব্যাঙ্ক লোন বা ধনীর বিনিয়োগের প্রতি লোভ কমাতে হবে। ব্যাঙ্ক লোন নেওয়া যেতে পারে তবে তা গ্রামবাসীই নেবে এবং গ্রামেই বিনিয়োগ করবে।

    এখন প্রশ্ন হল, গ্রামবাসী কিসে বিনিয়োগ করবে? গ্রামীণ অর্থনীতি এখনও কৃষিনির্ভর। এখনই ডিজিটাল ইন্ডাসট্রি বা হাইটেক শিল্প স্থাপনের ক্ষমতা আমাদের নেই। আর বেশিরভাগ কৃষির সমস্যা হল রেইট অফ রিটার্ন বা মুনাফার হার কম। এখানে আমাদের কৃষকদের বুদ্ধি খাটাতে হবে। যাই চাষ হোক না কেন, তাতে নিজেদেরই ভ্যালু অ্যাড করতে হবে। যেমন চাউল থেকে পাফড রাইস বা ভুট্টা থেকে কর্ন ফ্লেক্স এই টাইপের রূপান্তর শুরু করতে হবে এবং তা গ্রামেই। এখন প্রশ্ন দাঁড়ায়, কিভাবে তা সম্ভব? আসলে সবাই মিলে বিনিয়োগ করলে এই ধরণের ফ্যাক্টরি করা কোন ব্যাপারই নয়। দেখা যায়, গ্রামের চাউলের বা মুড়ির কল একজন মালিকের এবং তিনিই গ্রামের সবচেয়ে ধনী মানুষ। এই বিষয়টার বাত্যয় দরকার। সব কৃষক মিলে ফ্যাক্টরি দিতে পারে। যদি গ্রামে ১০০০ একর কৃষিজমি থাকে তাহলে ১০ একরে ফ্যাক্টরি দিয়ে বাকি ৯৯০ একরে চাষ চালাতে হবে। জমিতে উৎপন্ন ফসল ঐ ফ্যাক্টরিতে পণ্যে রূপান্তর করতে পারলে লাভ সাত/আট গুণও করা সম্ভব। এক কেজি ভুট্টার দাম মাত্র ৪০/৫০ টাকা কিন্তু ১ কেজি কর্ন ফ্লেক্সের দাম ৬০০/৭০০ টাকা, অর্থাৎ উৎপাদন খরচ বাদ দিলেও রূপান্তরের ফলে মুনাফা বেড়ে যাবে অনেক গুণ। বর্তমানে এই কর্ন ফ্লেক্স বা মুড়ির উৎপাদন পুরাই ধনিক শ্রেণী দ্বারা পরিচালিত। এই পরিচালনার ভার গ্রামবাসীকেই নিতে হবে। একসাথে নিতে হবে, মোড়লের হাতে দিলে হবে না।

    উদ্ভিজ্জ ফসল থেকে প্রাণীজ উৎপাদনেও মুনাফার হার বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। একই পরিমাণ জমিতে ধান চাষ করলে যে লাভ, মুরগি, মাছ বা টার্কি চাষ করলে একই সময়ে তার ৪/৫ গুণ লাভ করা সম্ভব। এইভাবে সেক্টর পরিবর্তন করেও আমাদের কৃষকগণ মাথাপিছু আয় অনেক বাড়াতে পারেন। আবার প্রাণীজ উৎপাদের রূপান্তর ঘটিয়ে মুনাফা আরও বাড়ান সম্ভব। যেমন মাংসের বিভিন্ন রেডিমেইড আইটেম বানানো সম্ভব। মাংসের শুঁটকি বা জার্কি, অথবা প্রক্রিয়াজাত রান্না করা মাংস ইত্যাদি উৎপাদন করে মুনাফা আরও বৃদ্ধি সম্ভব, বিদেশেও রপ্তানি করা যেতে পারে। এগুলোর জন্য খুব স্পেশাল কোন দক্ষতাও দরকার নেই। তবে এসব প্রক্রিয়াজাতকরণ গ্রামেই করতে হবে, গ্রামবাসীকেই করতে হবে। সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট দক্ষ করতে।

    সমগ্র উৎপাদন এবং বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়াটি সমন্বিত হওয়া আবশ্যক। অর্থাৎ গ্রামবাসীকেই একসাথে উৎপাদিত পণ্য পরিবহনের জন্য ট্রাক কিনতে হবে, নিজেদের কাউকেই সেই ট্রাক চালাতে হবে। শহরে বিক্রির জন্য দোকান ভাড়া করতে বা কিনতে হতে পারে। কিন্তু তা নিজেদেরকেই করতে হবে, তাহলে সর্বাধিক মুনাফা গ্রামবাসীর হাতেই থাকবে।

    গ্রামবাসী যে মুনাফা পাবেন তা দিয়ে নিজেদের অবস্থানের পরিবর্তনের সাথে সাথে গ্রামেই কিছু সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধির চেষ্টা করবেন। যেমনঃ গ্রামেই ভাল খাবার, থাকার ব্যবস্থা, পরিবহন, বিনোদন ইত্যাদির উৎকর্ষ সাধনের চেষ্টা করবেন, যেন মানুষ গ্রামে থাকতে উৎসাহিত হয়, নরকের মত নোংরা দূষিত শহরে যেতে না চায়। এমন করলে গ্রামেই ভাল শিক্ষকগণ চলে আসবেন, থাকবেন এবং বাচ্চাদের পড়াবেন। গ্রামবাসীর ভেতর থেকেই ভাল শিক্ষক তৈরি করতে হবে। কেউ শহরে শিক্ষকতায় ভাল করলে তাকে আবার গ্রামে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। এভাবে সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধির মাধ্যমে ডাক্তারদেরও গ্রামেই রাখা সম্ভব।

    এসব ভাবলে অনেকটা ইউটোপিয়ান মনে হয়। কিন্তু আমি তরুণদের মাঝে এমন সম্ভবনাময় মানুষ দেখি যারা এমন পরিবর্তন সাধনে সক্ষম। গ্রামেও আছে এমন মানুষ। তাঁদের দরকার উৎসাহ, সমর্থন আর সাহস। আসুন আমরা সবাই মিলে গ্রামের মানুষের শহর অভিমুখিনতা কমানোর চেষ্টা করি, গরীবের কষ্টার্জিত অর্থের ধনী অভিমুখিনতা দমানোর চেষ্টা করি। গ্রামেই মানসম্মত জীবনযাপনের সুযোগসুবিধাগুলো সৃষ্টি করি। নয়ত সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা অসম্ভব; সীমাহীন বৈষম্যে ভরা সমাজ সোনার হয় কিভাবে? এক্ষেত্রে সরকার এবং সরকারি কর্মচারীগণ অসামান্য সহযোগী ভূমিকা পালন করতে পারেন। তবে গ্রামীণ অর্থনীতির মূল বিনিয়োগকারী এবং চালিকাশক্তি হিসেবে গ্রামবাসীকেই অবতীর্ণ হতে হবে। এইটা গ্রামবাসীর বোঝা বড্ড জরুরী। বোঝানোও জরুরী।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *